ডালিম ঔষধি ও পুষ্টি গুনে ভরপুর একটি অসাধারন সুন্দর ফল
ডালিম ঔষধি ও পুষ্টি গুনে ভরপুর একটি অসাধারন সুন্দর ফল
ডালিম ঔষধি ও পুষ্টি গুনে ভরপুর একটি অসাধারন সুন্দর ফল, তাই ডালিমকে স্বর্গীয় ফল বলা হয়, কারণ এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধের জাদুকরী গুনাগুন, আমাদের দেশে ডালিম প্রায় সারা বছর পাওয়া যায় ,ডালিম গাছ সাধারনত ৫-৮ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়, পাকা ফল দেখতে লাল রঙের হয় । ডালিম ফলের খোসার ভিতরে লাল রঙের দানা দানা থাকে, এই দানা গুলি খুবিই সুসাধু এবং রসালো, তাই ছোট বড় প্রায় সব মানুষই ডালিম খুব পছন্দ করে, দালিমের এর আদি নিবাস ইরান এবং ইরাক, ডালিম ফল ডালিমগাছের পাতা, ছাল, মূল, মূলের ছাল এই গাছের প্রায় সব কিছুই ঔষধি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
ডালিম ফল দেখতে অসাধারন একটি সুন্দর ফল, ডালিম কাঁচা অবস্থায় সবুজ এবং পাকলে হলুদ এবং লাল রঙের হয়, ফলের ভিতরে বীজের কোষ হয় এবং কোষের উপর পাতলা আবরণ থাকে, পাকা ফলে বীজ গোলাপী ও সাদা হয়, ডালিম ফলের মোট ওজনের বৃহত্তর অংশই খোসা ও বীজ, ডালিম গাছ থেকে প্রায় সারা বছর ফল পাওয়া যায়।
ডালিম মানব শরিরের জন্য খুবিই উপকারি একটি ফল , ডালিম পুষ্টি ও ওষুধি গুনে ভরপুর, ডালিমের পুষ্টিমান - প্রতি ১০০ গ্রাম ডালিমে ৭৮ ভাগ জল, ১.৫ ভাগ আমিষ, ৫.১ ভাগ আঁশ, ১৪.৫ ভাগ শর্করা, ০.৭ ভাগ খনিজ, ১০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ১২ মিলিগ্রাম ম্যাগনেসিয়াম, ১৪ মিলিগ্রাম অক্সালিক এসিড, ৭০ মিলিগ্রাম ফসফরাস, ০.৩ মিলিগ্রাম রাইবোফ্লাভিন, ০.৩ মিলিগ্রাম নায়াসিন, ১৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি থাকে, আয়ুর্বেদ চিকিত্সা বিজ্ঞানে ডালিমের ব্যবহার সব জায়গায় এবং কুবি পরিচিত।
ডালিমের ঔষধি গুণ, ডালিম ফল আয়ুর্বেদিক ও ইউনানী চিকিত্সায় বেশী ব্যাবহার করা হয়, ডালিমে বিউটেলিক এসিড, আরসোলিক এসিড এবং কিছু আ্যলকালীয় দ্রব্য যেমন সিডোপেরেটাইরিন, পেপরেটাইরিন, আইসোপেরেটাইরিন, মিথাইলপেরেটাইরিন প্রভৃতি মূল উপাদান থাকায় ইহা বিভিন্ন রোগ উপশমে ব্যাবহার করা হয়, ডালিম ফল কোষ্ঠ রোগীদের জন্য অত্তান্ত উপকারী একটি ফল , ডালিম গাছের শিকড়, ছাল ও ফলের খোসা দিয়ে আমাশয় ও উদরাময় রোগের ওষুধ তৈরি হয়, ডালিম ফল খাবারে রুচি বাড়ায়, এবং সরিরের পানি শূন্যতা দূর করে, ডালিম ফল মানব দেহে শক্তি যোগায় এবং শরিরের জ্বালা পুড়া ভাব দূর করে, ডালিম ফল খেলে মানুষের শরির ও মন তাজা থাকে ।
ডালিম হৃত্পিণ্ড ভালো রাখতে বিশেষ ভাবে সহায়তা করে, আমাদের জীবন যাত্রায় অন্যতম আতঙ্ক রোগ হল হৃদরোগ, আর শরীর সুস্থ রাখতে হলে নিজেকে সচল রাখতে হবে, আমরা প্রায় বেশির ভাগ মানুষই জাঙ্ক ফুড কে খাবার হিসাবে বেছে নিয়েছি এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমাদের হার্ট , তাই হার্ট বা হৃদরোগ আমাদের জীবন যাত্রার সাথে যেন জড়িয়ে গিয়েছে, আমরা প্রতিদিন এই সকল তেল চর্বি জাতীয় খাবার গ্রহণ করার ফলে আমাদের ধমনীর আবরণে চর্বি জাতীয় পদার্থ জমে যাচ্ছে, যার ফলে ধমনী আস্তে আস্তে শক্ত হয়ে সংকুচিত হতে থাকে, আর তাই আমাদের হৃদরোগের সম্বাবনা বেড়ে যায়, আমাদের হাতের কাছেই আছে আমাদের হার্ট কে ভালো রাখার উপায়, মানব শরীরের মাংস পেশিতে দ্রুত অক্সিজেন পৌঁছে দেয় ডালিম বা বেদানা রস, প্রতিদিন একটা বেদানার রস আমাদেরকে দিতে পারে হৃদরোগের হাজারো সমস্যা থেকে মুক্তি,
নিয়মিত ডালিম বা বেদানার রস খেলে মানব শরীরে জমে থাকা চর্বির স্তরকে গলিয়ে পরিষ্কার করে দেয় , বেদানায় উপস্থিত থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট কোলেস্টরল নিয়ন্ত্রণ রাখতে সাহায্য করে, ডালিম আমাদের শরীরে রক্তের মধ্যে মোনোসাইট কেমোট্যাকটিক প্রোটিন ক্ষতিকর পদার্থ কমিয়ে দেয়, ফলে আমাদের হার্ট সুস্থ থাকে বা হৃদরোগ হওয়ার সবাবনা কমিয়ে দেয় ।
ডালিম ত্বক সুস্থ ও উজ্জ্বল রাখতে ভালো কাজ করে , বেদানা বা ডালিম পোমেগ্র্যানেট অয়েল ময়শ্চারাইজার হিসেবে ভালো কাজ করে ও ত্বকের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণকে প্রতিরোধ তৈরি করে থাকে, ফলিক অ্যাসিড, ভিটামিন সি, সাইট্রিক আসিড, ট্যানিন সমৃদ্ধ বেদানা ত্বকের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে বিশেষ ভাবে কাজ করে।
ডালিম স্কিন ক্যান্সার প্রতিরোধে করে, ডালিম বা বেদানার রস ক্যান্সার প্রতিরোধে অনেক উপকারি খাদ্য, ভিবিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে স্কিন ক্যান্সার ও প্রস্টেট ক্যানসার প্রতিরোধ করতে বেদানার রস বিশেষ ভাবে সাহায্য করে, এবং অ্যানিমিয়া রোগীদের জন্য বেদানা রস খুবই উপকারি।
ডালিম রক্তস্বল্পতা দূর করতে সাহায্য করে, রক্তস্বল্পতা দূর করার জন্য বেদানাতে রয়েছে প্রচুর আয়রন, রুচি বৃদ্ধি করে, কোষ্ট কাঠিন্য রোধ করে, জন্ডিস, বুক ধড়ফড়ানি, বুকের ব্যথা,কাশি,ডালিম কণ্ঠস্বর পরিষ্কার করতে সাহায্য করে, পুরনো পেটের অসুখ ও জ্বর সারাতে সাহায্য করে।
ডালিম হাড় ভালো রাখতে বিশেষ ভুমিকা রাখে, হাড়ের সংযোগস্থলে কার্টিলেজ নামে অস্থি রস থাকে যা হাড়ের ক্ষতি করে, বেদানার রসে আছে পটাশিয়াম ও পলিফেনল যা কিনা কার্টিলেজ নামক রোগ রোধ করার জন্য খুবই উপকারী, ডালিম হাড়ের নানাবিধ রোগ যেমন হাড়ের অস্টিওপোরেসিস থেকে মুক্তি পাওয়া যায় খুব সহজেই ।
ডালিম দাঁতের যত্নে বেশ কার্যকরী , বেদানাতে উপস্থিত রয়েছে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট যা দাঁতে প্লাক জমতে বাধা দেয়, জিন জিভাইটিস নামে মাড়ির রোগ প্রতিরোধ করতে বেদানার ভূমিকা অপরিসীম, আমরা আমাদের দাঁত ভালো রাখার জন্য প্রতিদিন অল্প হলেও বেদানা খাওয়া উচিত।
ডালিম ডায়রিয়া প্রতিরোধে সহায়তা করে ,ডায়রিয়া থেকে রক্ষা পেতে বেদানার রস খুবই উপকারি, ডায়রিয়া হলে সকাল-বিকাল বেদানার রস খেলে ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা যায় খুব সহজেই ।
ডালিম সর্দি-কাশি থেকে বাঁচতে সাহায্য করে , শীতের সময় সর্দি-কাশি লেগেই থাকে সর্দি-কাশি থেকে রক্ষা পেতে আমরা বেদানার রস ওষুধ হিসাবে ব্যবহার করতে পারি, ঠান্ডায় খুব বেশি কাবু হয়ে গেলে বেদানার রস খেলে উপকার হয়, বেদানাতে আছে পটাশিয়াম ও ফাইবার যা ইমিউন সিস্টেম মজবুত রাখতে সাহায্য করে।
ডালিম কোলেস্টরল নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভুমিকা রাখে, বেদানার প্রচুর পরিমাণে উপস্থিত অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট যা টক্সিন দূর করে ডিটক্সিফিকেশনে সাহায্য করে,মানব শরীরের কোলেস্টরল নিয়ন্ত্রনে বেদানার রসে আছে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা হার্টের মাসলসে অক্সিজেন সরবরাহ করে,এবং ফ্রি রেডিকেলস্ প্রতিরোধ করে কোলেস্টরেল বৃদ্ধিতে বাধা দেয়,ডালিম আর্টারি পরিস্কার রাখতে সাহায্য করে ডালিম বা বেদানা, বেদানার রস রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে কার্যকারী ভুমিকা রাখে, এর পলিফেনল অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট কার্ডিওভাসকুলার স্বাস্থ্য ভাল রাখতে সাহায্য করে, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি হলে রোজ বেদানার রস খাওয়া উচিত।
ডালিম মানব শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়,ডালিম বা বেদানার মধ্যে রয়েছে প্রচুর পটাশিয়াম ও ভিটামিন 'সি', প্রতিদিন বেদানার রস খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে, এর অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট গুণও গ্রিন টি বা রেড ওয়াইনের থেকে প্রায় তিন গুণ বেশি, এর মধ্যে রয়েছে তিন প্রকার অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট, ট্যানিন, অ্যান্থো সিয়ানিন ও এলাজিক অ্যাসিড, অ্যান্থোসিয়ানিন দেহ কোষ সুস্থ রাখার ফলে ভাইরাসের সংক্রমণ রুখতে পারে, ফলে ফোলা ভাব কমে যায়, ক্ষয় রুখতেও সাহায্য করে।
ডালিম রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে , প্রচুর পরিমাণ অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট থাকার কারণে বেদানা সিস্টোলিক ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, ফলে স্ট্রেস, টেনশন কমে, ফলে হার্টের সমস্যা থাকলে হার্টের অসুখে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়।
ডালিম পেশির ব্যথা দূর করতে সাহায্য করে , বাত, অস্টিওআর্থারাইটিস, পেশির ব্যথা কমাতে সাহায্য করে ডালিম বা বেদানার রস ।
সতর্কতা
ফল সবার জন্য খুবই উপকারি, সব বয়সের মানুষের উচিত রোজ একটি করে ফল খাওয়া, কিন্তু এমন কিছু ফল আছে যা বিশেষ কিছু রোগ থাকলে খওয়া উচিত নয়, কোন রোগ হলে ডাক্তাররা তাকে সুস্থ করে তোলার জন্য ফল খাওয়ার পরামর্শ দেন, কিন্তু ডালিম বা বেদানা খাওয়া সকলের জন্য উপকারি নয়, বেদানা যেমন সুন্দর দেখতে লাল রঙের হয়,তেমন খেতেও খুব সুস্বাদু হয়, বেদানার রস শরীরের পক্ষে খুব উপকারি, বেদানার রস মানব শরীরকে তরতাজা করে তোলে, তাই অনেকে তাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় বেদানা রাখে, কিন্তু কখনো কখনো কারোর ক্ষেত্রে বেদানা মারাত্মক হতে পারে ,এমনকি প্রাণ সংশয় এর জুকি আছে ।
কম রক্তচাপের লোকেদের বেদানা খওয়া একদম উচিত নয়, আজকাল উচ্চ রক্তচাপের রোগ বেশির ভাগ মানুষের থাকে, তাদের জন্য বেদানা একটি আশির্বাদ, বেদানা সেবনে উচ্চরক্তচাপের সব সমস্যা কমে যায়, আর আপনার যদি কম রক্তচাপের মত সমস্যা থাকে তাহলে আপনার জন্য বেদানা মারাত্মক ক্ষতিকারক, কারণ তাতে রক্তচাপ আরো কমে যেতে পারে, আর তার ফলে প্রাণ সংশয় হতে পারে ।
মানসিক রোগে আক্রান্ত যেসব রোগীরা, যারা নিয়মিত মানসিক রোগের জন্য ওষুধ খান তাদের জন্য বেদানা প্রায় বিষের সমান।
সর্দি কাশিতে বেদানা খেলে শরীরের আরো ক্ষতি হয়, বেদানা সাধারনত ঠান্ডা ফল, তাই সাধারনত গরমকালেই এই ফল খাওয়া হয়, যাদের সর্দি কাশি বা ঠান্ডা লাগার ধাত আছে তাদের বেদানা খওয়া উচিত নয়, এর ফলে আরো ঠান্ডা লাগতে পারে, তাদের বেদানার পরিবর্তে গরম কিছু খাওয়া উচিত।
অ্যালার্জিতে বেদানা খওয়া ক্ষতিকর, এমন অনেক লোক আছে যাদের ধুলো, বালি বা কোন নোংরাতে অ্যালার্জি আছে, তাদের পক্ষে বেদানা খওয়া খুব ক্ষতিকর, বেদানায় এমন কিছু উপাদান আছে যা অ্যালার্জির সমস্যাকে বাড়িয়ে তোলে, তাই আপনাদের মধ্যে যদি এই ধরনের কোন সমস্যা থাকে তাহলে ডালিম বা বেদানা না খাওয়াটাই ভালো ।
ধন্যবাদ, আপনার মূল্যবান সময় দিয়ে এই লেখাটি পড়ার জন্য ।


No comments