মেথির আছে অসাধারন ঔষধি ও পুষ্টি গুন
মেথির আছে অসাধারন ঔষধি ও পুষ্টি গুন
মেথি একটি অসাধারন মসলা জাতিও খাবার, যা আমরা অনেকেই এর ব্যাবহার ভিবিন্ন ভাবে
করে থাকি, এতে আমরা মেথির পরিপূর্ণ স্বাদ,ঔষধি গুন,পুষ্টি গুন সহ সব উপকারী গুন
আমরা সজেই গ্রহন করি, মেথি বললেই প্রচুর সুস্বাদু
খাবারের নাম আমাদের মনে চলে আসে,মেথি যেন রান্নায় স্বাদ বর্দ্ধকের কাজ করে, আমাদের
অতি প্রিয় পাঁচফোড়নের একটা উপাদান হল এই মেথি, তাই মানব দেহ সুস্থ রাখতে মেথির আছে
বিশেষ ভূমিকা আজ আমরা জানবো মেথির উৎস এবং ইতিহাস।
মেথি (ট্রিগনেল্লা ফেনুম গ্রাইকুম )
হল একপ্রকার ভেষজ গাছ যা দক্ষিণ ইউরোপ এবং এশিয়ার ভিবিন্ন অঞ্চলে পাওয়া যায়, মেথি
দেখতে হলুদাভ খয়েরি রঙের হয়, মেথিতে থিয়ামিন, ফলিক এসিড, রিবোফ্লাভিন, নিয়াসিন, ভিটামিন এ, বি৬, এবং সি তে পরিপূর্ণ, এই ভেষজে
নানারকমের প্রয়োজনীয় মিনারেল সহ রয়েছে ভিবিন্ন ঔষধি গুন, যেমন মেথিতে আছে কপার, পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম, আয়রন, সেলেনিয়াম,,জিঙ্ক, ম্যাঙ্গানিজ এবং ম্যাগনেসিয়াম, মেথি গাছের পাতায় প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন কে-এর
উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়, প্রতি ১০০ গ্রাম মেথি শাক থেকে ৫০ ক্যালোরি শক্তি পাওয়া
ছাড়াও ১.৫ গ্রাম (৭%) স্যাচুরেটেড ফ্যাট, ৬৭ মিলিগ্রাম (২%) সোডিয়াম, ৭৭০ মিলিগ্রাম (২২%)
পটাশিয়াম, ৫৮ গ্রাম (১৯%) কার্বোহাইড্রেট এবং ২৩ গ্রাম (৪৬%) প্রোটিন পাওয়া যায় যা মানব
শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী, এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার, তাই নিয়মিত মেথি
খেলে শারীরিক সুস্থ থাকা যায় ।
মেথি শরীরের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমাতে খুবই গুরুত্ব পূর্ণ ভূমিকা রাখে,মেথিতে
থাকে স্টেরিওডাল সেপোনিনস নামক উপাদান যা শরীরে থাকা কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে
সাহায্য করে, মেথি শুধুমাত্র রক্তে উপস্থিত কলেস্টেরল থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য
করে তা নয় আপনার শরীরকেও ধীরে ধীরে কলেস্টেরল থেকে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা
করতে ভীষণভাবে সক্ষম, মেথি শরীরের লিপো প্রোটিন বা ব্যাড প্রোটিন কমাতে সাহায্য
করে,মেথির বীজে উপস্থিত স্টেরিওডাল স্যাপোনিন ক্ষুদ্রান্তে কলেস্টেরল-এর
আত্তীকরণের হার কমিয়ে দেয়, এছাড়া লিভার থেকে উৎপন্ন তরলের শোষণের হার কমিয়ে দিতেও
কার্যকর চর্বিযুক্ত খাবার থেকে নির্গত হতে থাকা ট্রিগ্লাইসারাইড-এর শোষণের মাত্রাও
মেথি কমিয়ে দিতে কার্যকরী ভূমিকা রাখে।
মেথি হার্টের কর্মক্ষমতা বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখে, হার্টের স্বাস্থ্য
রক্ষায় মেথির উপকারিতা অপরিসীম, মেথি শরীরে থেকে অ্যাসিডের পরিমাণ খুব দ্রুত কমাতে
পারে, শরীরের অ্যাসিডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে এর থেকে কার্যকরী ভেষজ আর পাওয়া যায়
না, মেথির বীজ সারারাত্রি জলে ভিজিয়ে রেখে দিয়ে পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে খালি
পেটে খেয়ে নিলে হার্টের ব্যাথা বা বুক জ্বালার মতন সমস্যা গুলো ওষুধ না খেয়েই
ঘরোয়া পদ্ধতিতে কমে যাবে, এছাড়া মেথিতে গ্লেকটোম্যানান নামক একটি উপাদানের খোঁজ
পাওয়া গেছে যা হার্টের কর্মক্ষমতা বাড়াতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে, এছাড়া এতে থাকা
পটাশিয়াম রক্তে লবনের পরিমাণ কমিয়ে আনতে সাহায্য করে যার ফলে ব্লাড প্রেসার
নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাই নিয়মিত মেথি ভেজানো পানি পান করলে হঠাৎ করে স্ট্রোক বা
হার্ট অ্যাটাকের মাত্রা অনেকংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
মেথি রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশেষ কার্যকর ভূমিকা রাখে,যাদের
কম বয়সেই রক্তে চিনির পরিমাণ অর্থাৎ ব্লাড সুগার ঊর্ধমুখি থাকে তারা নিয়মিত মেথি
ভেজানো পানি খেতে পারেন, এটি তাদের শরীরে গ্লেকটোমেনানের পরিমাণ বাড়ানো ছাড়াও
দেহে শর্করার শোষণের পরিমাণ কমিয়ে আনে, এতে রক্তে সুগার লেভেল বাড়ার আশঙ্কা অনেক
কমে যায়, এছাড়া মেথিতে থাকা অ্যামাইনো অ্যাসিড ইনসুলিনের কর্মক্ষমতাকে বাড়িয়ে
দেয় ফলে ব্লাড সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া থেকে মুক্তি পাওয়া যায়
খুবই সহজেই ।
মেথি হজম শক্তি বৃদ্ধিতে বিশেষ ভাবে সহায়তা করে,সহজ উপায়ে দেহে হজম শক্তি
বৃদ্ধি করতে মেথি বীজ দারুণ ভুমিকা রাখতে পারে, মেথিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে
ফাইবার ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা বাওয়েল মুভমেন্টে উন্নতি করে হজমে অনেক সহায়তা করে
থাকে, তাই কনস্টিপেশনের সমস্যা দূর করতে নিয়মিত সকালে খালি পেটে মেথি ভেজানো পানি
খাওয়া প্রয়জন এতে ভাল ফল পাওয়া যাবে ।
মেথি দেহের ওজন কমাতে সহায়তা করে, প্রতিদিন সকালে মেথি ভেজানো পানি পান করলে
তা শরীরের স্থূলতা কমাতে সাহায্য করে, কেউ যদি প্রতিদিন সকালে খালি পেটে মেথি বীজ
পানিতে ভিজিয়ে খাওয়ার অভ্যাস করে তাহলে তাঁর শরীরে ধীরে ধীরে ফাইবারের মাত্রা
বাড়তে থাকে, এতে একদিকে যেমন তাঁর ক্ষিদে কমে যায় অন্যদিকে অতিরিক্ত খাবার
গ্রহনেও লাগাম পরে, এতে শরীরের ওজন আস্তে আস্তে কমতে শুরু করে।
মেথি জ্বরের প্রকোপ কমাতে ও সর্দি-কাশি সারাতে সাহায্য করে, আবহাওয়া
পরিবর্তনের কারণে অনেক সময় জ্বর হয়, এ অবস্থায় কেউ যদি এক গ্লাস মেথি বীজের পানি
পান করেন তাহলে শরীরের জন্য অনেক উপকার হয়, মেথিতে বেশ কিছু উপকারি উপাদান রয়েছে
যা দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে অনেক বৃদ্ধি করে এবং দ্রুত জ্বরের প্রকোপ কমাতে
সাহায্য করে, এছাড়া সর্দি-কাশি সারাতেও ঘরোয়া চিকিৎসা হিসাবে এর বিকল্প নেই বললেই
চলে।
মেথি চুল পড়া রোধে সহায়তা করে, বহুকাল ধরে চুল পড়া রোধে মেথির ব্যবহার হয়ে
আসছে,স্বাস্থ্যহীন চুলের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত খাওয়া ছাড়াও বেটে মাথায়
দেওয়া যেতে পারে, এজন্য মেথি বাটা নারিকেল তেলের মধ্যে সারা রাত মেথি বাটা চুবিয়ে
রেখে সকালে চুলে মেখে এর ঘণ্টাখানেক পর গোসল করে ফেললে যথেষ্ট উপকার পাওয়া সম্ভব।
মেথি ত্বক উজ্জ্বল রাখতে ভালো কাজ করে, রূপচর্চায়ও মেথির ভুমিকা অপরিসীম,
চেহারায় বলিরেখা দেয়ার জন্য দায়ী নানা ক্ষতিকর উপাদান দূর করতে মেথির ব্যবহার করা
যায়, এ ছাড়া চোখের নিচে কালো দাগ দূর করতেও মেথির বিশেষ ভুমিকা রয়েছে।
মেথি খুশকি দূর করতে সাহায্য করে,অনেকের চুলে প্রচুর খুশকি হয়ে থাকে যা মাথার
শুষ্ক ও মৃত ত্বকের কারণে হয়ে থাকে, খুশকির সমস্যা দূর করতে মেথি সারারাত পানিতে
ভিজিয়ে রেখে বেটে পেস্ট তৈরি করতে হবে তবে চাইলে এর সাথে দই মেশানো যেতে পারে, এই
মিশ্রণ মাথার ত্বকে লাগিয়ে তিরিশ মিনিট পর ধুয়ে ফেলতে হবে, নিয়মিত এর ব্যবহারে
দ্রুত খুশকি চলে যাবে।
মেথি মহিলাদের ঋতুকালীন ও প্রসবজনিত সমস্যার সমাধানে গুরুত্ব পূর্ণ অবধান
রাখে, মেথিতে সাইটো-ইস্ট্রোজেন নামক উপাদান থাকে যা নারীদেহে প্রোলাকটিন নামের
হরমোনের মাত্রার বৃদ্ধি্তে সাহায্য করে, এই হরমোন নারীদেহকে সুগঠিত করতে সাহায্য
ছাড়াও ঋতুকালীন বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে খুবই কার্যকরী, এছাড়া বিশেষজ্ঞরা জরায়ুর
সংকোচন ও প্রসারণের যন্ত্রণা কমাতে মেথির অবদান বা তা প্রমান ও করেছেন, তবে
অতিরিক্ত খাওয়া হলে গর্ভপাত বা অপরিণত শিশুর জন্মদানের আশঙ্কা দেখা দিতে পারে, তাই
অবশ্যই গর্ভবতী মায়েদের আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে তারপর খেতে হবে।
মেথি ক্যান্সারকে দূরে রাখতে সহায়তা করে, রক্তে যদি টক্সিক উপাদানের মাত্রা
বাড়তে থাকে তাহলে ক্যান্সার সেলের জন্ম
নেওয়ার আশঙ্কাও বেড়ে যায়, আর এই ক্যান্সারকে দূরে রাখতে মেথি বীজের রয়েছে
গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা, এতে থাকা ক্যান্সার প্রতিরোধী উপাদান রক্তে ভেসে বেরানো
টক্সিক উপাদানগুলোকে শরীর থেকে বের করে দিতে সাহায্য করে, তাই শরীরে ক্যান্সার
সেলের জন্ম নেওয়া প্রতিরোধ করতে নিয়মিত মেথিশাক কিংবা এর বীজ খাওয়া উচিত।
গত কয়েক দশক ধরে দেশ ও বিদেশে একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে মেথি বীজে রয়েছে
প্রচুর মাত্রায় প্রোটিন, উপকারি ফ্য়াট, ভাল কোলেস্টেরল, ডায়াটারি ফাইবার এবং আরও বেশ
কিছু খনিজ এবং মিনারেল, এসব উপাদান নানাভাবে মানব শরীরের উপকারে কাজ করে, তাই
সুস্থ থাকতে চাইলে নিয়মিত মেথি খাওয়া বা মেথির ব্যবহার আমাদের খুবই প্রয়জন ।
ধন্যবাদ, আপনার মূল্যবান সময় দিয়ে এই লেখাটি পড়ার
জন্য ।


No comments